Get the Latest News & Videos from News24 > সাহিত্য > রবীন্দ্র বিরোধীতায় দোরা-কাউয়ারা

লেখক: ভানুলাল দাস

এক শ্রেণির সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবি রয়েছেন যারা রবি ঠাকুরের জন্ম ও মৃত্যু দিবসে তার বিরুদ্ধে নানা রকম অদ্ভুতুরে কথা,বলে রবীন্দ্র সাহিত্য বর্জন করার কথা বলেন। রবীন্দ্রনাথ অত্যাচারী জমিদার শ্রেণির প্রতিনিধি, প্রজাপীড়ক ও বদমেজাজী। তার পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর যে মানসিকতার কারণে নির্দয় ভাবে দরিদ্র উপেনের দুই বিঘা জমি কেড়ে নিয়েছিলেন সেই মানসিকতা পৌত্র রবীন্দ্রনাথেরও ছিল। তাই রবীন্দ্র সাহিত্য বর্জনীয়!
এই ধরনের বালখিল্য যুক্তি দিয়ে আসলে তারা কি বুঝাতে চান? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কি এভাবে বাংলাভাষীর জনপদে অপ্রাসঙ্গিক করা সম্ভব?
রবি ঠাকুর শ্রেণির উর্ধে কেউ হন। তিনি নব্য জমিদার শ্রেণির ৩য় প্রজন্মের প্রতিনিধি ছিলেন। শ্রেণির উর্ধে উঠা সোজা কথা নয়, লেনিন পর্যন্ত স্বীকার করেছেন, তিনি মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানসিকতা ত্যাগ করে শ্রমিক শ্রেণির কেউ হতে পারেন নি। বড়জোর তিনি পেটিবুর্জোয়া কৃষকের মানসিকতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। রবি ঠাকুর তা যে পারেন নি, এটি অবাক কোন বিষয় নয়।
ঠাকুর বংশে জমিদারি প্রথম ক্রয় করেন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, রবির পিতামহ। আর কে না জানে ১৭৯৩ সালের লর্ড কর্নওয়ালিশ যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তো ( Permanant Settlement Regulation) চালু করেছিলের তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ভূমিকর বা রাজস্ব বৃদ্ধি, প্রজাকল্যাণ নয়। মোগল বা বাদশাহী আমলের জমিদার, তালুকদার, চকদার ইত্যাদি ভূস্বামীদের প্রতিক্রিয়াশীলতা ও খাজনার নামে প্রজা নিপীড়নের কোন কমতি ছিল না। ওই শ্রেণিটি কালক্রমে দেওলিয়া হয়ে যায়। আর এরিমধ্যে জমিদারের নায়েব খাজাঞ্চী আমলা এবং ইংরেজকে কাঁচা মাল বিক্রি করে একটি মধ্যস্বত্তভোগী শ্রেণির সৃষ্টি হয়। তাদের হাতে এসে যায় কাঁচা পয়সা। এক পর্যায়ে কোলকাতা কেন্দ্রিক নব্য ধনী বাবুরা ইংরেজদের মত কোলকাতায় ব্যাংক স্থাপন করে শিল্পকারখানা স্থাপনে উদ্যোগী হয়। ইংরেজ শাসক এতে প্রমাদ গনলেন। এই হলে ভারতীয়রা পন্য তৈরি করে বাজার দখল করবে। ইংরেজের মনোপলি বিজনেস হুমকিতে পড়বে। তখনকার গভর্নর জেনারেল লন্ডনকে বিষয়টা জানান এবং অনুমতি নিয়ে নব্য ধনী অথচ আভিজাত্যহীন শ্রেণিটিকে জমিদারি কেনাতে নগদ অর্থ ব্যয় করতে অনুপ্রাণিত করেন। অভিজাত শ্রেণিতে উন্নীত হতে ওরা ইংরেজের টোপ গিলে।
খাজনা বাকি, সূর্যাস্ত আইন করে পুরাতন জমিদারদের জমিদারি নিলামে চড়ান। এবং প্রিন্স দ্বারোকা নাথের মত লোকরা জমিদারি কিনে নেয়। কিন্তু জমিদারি ১০০ বছরের মধ্যে অলাভজনক হয়ে পড়ে। তাদের জমিও নিলাম হয়ে যায়। ১৮৮৫ সনের বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ত আইন, ১৯১৩ সনের তালুকদারি পত্তনি আইন জমিদারদের আরও পঙ্গু করে দেয়। এই আইন দুটি প্রজা উচ্ছেদ নিষিদ্ধ করে, তালুকদার বা ছোট ছেট জমিদারদেরকে বড় জমিদারদের হাত থেকে স্বাধীন করে দেয়। নিজস্ব জমির সিলিং বেধে দেয় ৩০০ বিঘা। ফলে ১৯৫০ সনে জমিদারি উচ্ছেদ আইনের আগেই জমিদারদের অবস্থা দাঁড়ায়, ” উপরে টাটফাট ভেতরটা সদরঘাট”। ইংরেজকে খাজনা দিতে না পারায় রবীন্দ্রনাথ শিলাদহের জমিদারি ফেলে চলে এসেছিলেন।
এবার আসি আসল কথায়। ফ্রেডারিক এঙ্গেলস ‘এন্টি ডুরিং” প্রবন্ধে লিখেছিলেন, মুরগী তা-এ হাঁসের ডিম ফুঁটে বাচ্চা হলে, ঐ বাচ্চাগুলো যখন পানিতে নামতে চাইল, মা হাঁস বলল, “যেয়ো না বাচারা। দিঘিতে বসার জন্য চৌকাঠ নাই।” কিন্তু হংস ছানারা পানিত নেমে পড়ে স্বভাবগত কারণে।
এর অর্থ সহজ। পুজিপতি লাভ করবে, জমিদার খাজনা আাদায় করবে, ব্যবসায়ী লাভ করবে। এটাই ঐ প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থার চিরন্তন নিয়ম। প্রফিট ছাড়া পূঁজি বাঁচে না, পরিণামে পূঁজিপতিরও বিনাশ ঘটে।
রবি ঠাকুর অত্যাচারি জমিদার(!) হয়ে থাকলেই কি তার সাহিত্য পরিত্যজ্য? তাহলে তো জুয়ারী দস্তয়ভস্কি, দুষ্ট জমিদার টলস্টয়, চুরি করে জেলখাটা ব্যালজাক, ভবঘুরে মার্ক টুয়েন এমন বহুজনকে বাদ দিতে হবে।
রবি ঠাকুর কি অত্যাচারী সামন্ত শ্রেণি জমিদারদের সাহিত্যে মহিমান্বিত করেছেন, যা তার শ্রেণি চরিত্রের প্রতিফলন? না। বরং তিনি যোগাযোগ, দুইবিঘা জমি, শাস্তি, প্রশ্ন এমন বহু গল্প, উপন্যাস কবিতায় জমিদার শ্রেণির প্রতিক্রিয়াশীলতা ও পতন দেখিয়েছেন। জমিদারের প্রতিভু কুমুকে নিরেট মূর্খ মধুসূদনের নিকট আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের অনিবার্য সত্য তুলে ধরেছেন; জমিদার শ্রেণি বুর্জোয়ার পেটে হজম হয়ে যাবে।
প্রতিভাবানরা এমনি হন। তারা কালজয়ী ও ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা। তাই ব্যালজাক, টলস্টয়, তারাশংকর নিজের শ্রেণির দেওলিয়াত্ব ও পতন দেখিয়েছেন সাহিত্যে। রবীন্দ্র প্রতিভা কালজয়ী বিধায় ঐতিহাসিক সত্যতাকে এড়িয়ে যান নি।
রবীন্দ্র বর্জনে রবি ঠাকুরের কিছু এসে যায় না। আমরা বাংলাভাষীরাই সংস্কৃতিতে পিছিয়ে যাব। তখন আবুলতাবুল সাহিত্যকে মহান করে তুলে সন্দেশ ভেবে সবাই বুটকলাই খাব। তা যারা খেতে চায় তারা বুটের ছাতু খাক। খেতে দাও। সবাই রবীন্দ্রনাথকে বুঝলে সমস্যা। দেশ নন্দনতাত্ত্বিকে ভরে যাবে যে! সবাই এরিস্ট্যাটল হলে দেশ চলবে কেমনে?
‘ আমার প্রাণের মাঝে সুধা আছে, চাও কি–
হায় বুঝি তার খবর পেলে না।
পারিজাতের মধুর গন্ধ পাও কি–
হায় বুঝি তার নাগাল মেলে না। “
যারা সুধা চায় না, সুধার খবর রাখে না, যারা পারিজাতের গন্ধের নাগাল পায় না, তাদের গুয়ের মাছির মত নর্দমার দিকে ঊড়াঊড়ি করতে দেয়া ভাল। কারণ ওরা ওখানে থাকলে লোকালয়ে রোগ বিস্তার কম করবে। তারা কবিতাও লিখে, কিন্তু সেই কবিতা “দোরা কাউয়ার পেয়ারা গাছে পাঁতিকাকের সাথে সোডোমির” অসভ্যতা। কেউ কেউ বলেন, রবি ঠাকুর এত বৈচিত্রময় বিষয় নিয়ে এত এত শৈল্পিক সাহিত্য লিখে গেছেন যে, এদের জন্য দোরা কাউয়া ছাড়া অবশিষ্ট কোনো বিষয় নেই।
রবি ঠাকুরকে বাতিল করার চেষ্টা হয়েছে বারবার। ষাটের দশকে আইয়ুব মোনায়েম খান রবীন্দ্র নাথকে নিষিদ্ধ করেছিল, তিরিশের দশকে আধুনিকতার নামে তাকে বর্জনের কথা উঠেছিল, মার্ক্সবাদীরা তাকে বহু আগে থেকে প্রতিক্রিয়াশীল আখ্যা দিয়েছিল। কিন্তু প্রতিবারই রবীন্দ্রনাথ প্রবল বেগে ফিরে এসেছেন। কারণ রবীন্দ্রনাথের আমাদেরকে প্রয়োজন নেই, বরং আমাদেরই প্রয়োজন তাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *