জঙ্গিদের মাথায় আইএসের টুপি : তদন্ত কমিটি গঠন

অনলাইন ডেস্ক: দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ জঙ্গি হামলা বহুল আলোচিত গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে জঙ্গি হামলা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামী রাকিবুল হাসা রিগ্যান ও জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধীর আদালত প্রাঙ্গণে আইএসের পতাকার আদলে টুপি পড়া নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা শুরু হয়েছে। এমনকি আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা আসামিরা ‘আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর’ বলে শ্লোগান দেওয়া নিয়ে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

আসামিরা আদালতে উপস্থিত আইনজীবী ও গণমাধ্যম কর্মীদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আমাদের বিজয় খুব শিগগিরই।’ পুলিশি হেফাজতে থাকার পর তাদের কাছে এরকম টুপি কীভাবে এলো তা নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তর ও কারা অধিদপ্তর পৃথকভাবে তদন্ত শুরু করেছে।

এ ব্যাপারে কাউন্টার টেরোরিজম এ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেছেন, ‘আদালত প্রাঙ্গণে একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি টুপি পরেছে এবং সেটাতে লেখা আছে, ‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহু, মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল’। তবে এটি আইএসের টুপি নয়।

আমার জানা মতে, আইএস কোনও টুপি তৈরি করেছে, পৃথিবীর কোথাও এরকম দৃষ্টান্ত নেই। এটি একটি টুপি। সেটিতে ‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহু’ লেখা। সেটি আইএসের পতাকার নির্দেশক হবে কিনা, তা বিশ্লেষণের ব্যাপার। তারপরও এটি কীভাবে কোথা থেকে এলো, সেটি আমরা তদন্ত করে দেখবো।’

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সকালে আদালতে আনার সময় অন্য আসামীদের সঙ্গে রাকিবুল হাসান ও জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধীর মাথায় টুপি ছিল না। রায় ঘোষণা শেষে সে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মাথায় আইএসের একটি টুপি পড়ে। কালো কাপড়ের তৈরি টুপিতে সামনে আরবীতে ‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহু, মুহাম্মদুর (সা.) রাসুল্লাহ’ লেখা ছিল। এরপরই তারা ‘আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর’ বলে রিগ্যান শ্লোগান দেয়।

এসময় উপস্থিত আইনজীবী ও গণমাধ্যমকর্মীদের বিষয়টি নজরে আসে। টুপি কোথায় থেকে পেলো-এমন প্রশ্নের জবাবে রিগ্যান বলে, ‘কারাগার থেকে নিয়ে এসেছি।’ পুলিশ প্রত্যেক আসামীকে আদালতের ভিতর থেকে বের করে প্রিজন ভ্যানের দিকে নিয়ে যায়। প্রিজন ভ্যানে তোলার সময় রিগ্যানের মাথায় কালো টুপি পরিহিত ছিল। এর আগে একই প্রিজন ভ্যানে জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধীকে নেয়া হয়। প্রিজন ভ্যানের ভিতরে রাজীব গান্ধীর মাথায় একই আদলের টুপি পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়। রাজীব গান্ধী চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘হলি আর্টিজানে হামলা চালিয়ে তারা কোনও অন্যায় করেনি। তারা এজন্য বেহেশতে যাবে। এই দেশে একদিন খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হবে।’

রিগ্যানের আইনজীবী দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আসামি চার বছর কারাগারে আছে। এ টুপি সে কোথায় পেলো, এটা তো আমার প্রশ্ন। এ বিষয়ে আমি আমি কিছু জানি না।’ এ বিষয়ে পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-কমিশনার জাফর হোসেন বলেন, ‘আমরা বিষয়টি নানা মাধ্যমে জানতে পেরেছি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখছি।’

আইজি (প্রিজন্স) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম মোস্তফা কামাল পাশা বলেন, বিষয়টি আমাদের নলেজে আসার পর গুরুত্বের সাথে নেই। আমরা ঘটনা তদন্তের জন্য অতিরিক্ত আইজি (প্রিজন্স) লে. কর্নেল আবরার হোসেনকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করি। কমিটি বুধবার বিকাল থেকেই তদন্ত শুরু করেছে। তদন্ত কমিটির প্রধান লে. কর্নেল আবরার হোসেন বলেন, আমরা তদন্ত শুরু করেছি। ৫ দিনের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়া হবে।

ঢাকা কেন্দ্রিয় কারাগারের জেলার মাহবুব হোসেন বলেন, বিষয়টি যখন নজরে আসে তখন থেকেই কারাগারের ভিডিও ফুটেজ পরীক্ষা করেছি। ভিডিও ফুটেজে তাদের কারো কাছে কেউ টুপি দিয়েছে-এমন দৃশ্য দেখা যায় নি। এমনকি কারাগার থেকে বের করে পুলিশের হাতে দেওয়ার সময় তাদেরকে বারবার শরীর তল্লাশি করা হয়েছে। সেখানে তাদের কাছে টুপি বা অতিরিক্ত কোন জিনিস ছিল না। কারাগার থেকে বন্দীদের যখন আদালতে নেওয়া এবং আদালত থেকে কারাগারে ফেরত দেওয়া পর্যন্ত সকল দায়িত্ব পুলিশের।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, কারাগার থেকে আসামিদের স্যান্ডেল পরিয়ে আদালতে নিয়ে আসলেও কাঠগড়ায় খালি পায়ে নিয়ে যাওয়া হয়। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতেই তাদের খালি পায়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

জানা গেছে, মামলার তদন্তে রাকিবুল হাসান রিগ্যান ওরফে রাফিউল ইসলাম রাফি ওরফে রিপন ওরফে হাসান ওরফে অন্তরের (২০) নাম এসেছে হামলাকারীদের প্রশিক্ষক হিসেবে। বসুন্ধরার যে বাসা থেকে হামলার পরিকল্পনা হয়, সেই বাসায় অনেক আগে থেকেই তার যাতায়াত ছিল। সেখানে হামলাকারীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। বয়সে তরুণ রিগ্যান ২০১৫ সালে বগুড়া সরকারি শাহ সুলতান কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে। ওই বছরের ২৬ জুলাই সকালে কোচিংয়ের কথা বলে ঘর ছাড়ে।

নব্য জেএমবির তরুণ প্রশিক্ষক হিসেবে গাইবান্ধা ও বগুড়ার বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে গুলশান হামলায় অংশ নেওয়া হামলাকারীদের ধর্মীয় ও শারীরিক প্রশিক্ষণ দেয় রিগ্যান। তার বাড়ি বগুড়ার জামিলনগর এলাকায়, বাবার নাম মৃত রেজাউল করিম।

২০১৬ সালের ২৬ জুলাই কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানায় অভিযানে পালিয়ে যাওয়ার সময় রিগ্যানকে গ্রেফতার করেন সিটিটিসি’র সদস্যরা। ওই বছরের ৩ অক্টোবর হামলায় নিজের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেয়। এ মামলায় পুলিশ তাকে গ্রেফতার দেখায় ২০১৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর। হামলায় অংশ নেওয়া মীর সামেহ মোবাশ্বীর, নিবরাস ইসলাম, খায়রুল, রোহান ইমতিয়াজ, পায়েল ও উজ্জ্বলসহ সাতজনকে প্রশিক্ষণ দেয় রিগ্যান।

নিউজ২৪.ওয়েব/ডেস্ক/মৌ দাস/আহসান শিপু

news24 bd

Read Previous

ট্রেনচালকের বুদ্ধিমত্তায় বাঁচিয়ে দিলো শত শত মানুষের প্রাণ

Read Next

ওসির বদলি: ‘ইয়াবা কাণ্ড’ এর তদন্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *