মুখ চেয়ে ধরায় আবরার কাঁদতেও পারেননি

অনলাইন ডেস্ক: বুয়েটের ছাত্রলীগের নেতারা রবিবার (০৬ অক্টোবর) আববার ফাহাদকে শেরেবাংলা হলের দোতলায় ছাত্রলীগ বুয়েট শাখার উপ-আইন বিষয়ক সম্পাদক অমিত সাহার ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নেয়। এ সময় ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার শিক্ষার্থী আবরারের মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে ফেসবুক ও মেসেঞ্জার ঘেঁটে দেখেই কোন বাদ বিচার ছাড়াই ক্রিকেটের স্টাম্প দিয়ে মারতে শুরু করেন। তাই দেখে সেখানে অবস্থাকারী সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন গালিগালাজ করতে করতে ক্রিকেটের অন্য আরেকটি স্টাম্প দিয়ে মারতে থাকেন আবরারকে।

ঘটনার দিন রাতে অনিক ও মেহেদীসহ অন্যরা একটু বেসামাল ছিলেন। অনিক সরকার প্রথমে কিল ঘুষি মারতে মারতে মেহেদী হাসান রবিনের হাত থেকে হকি স্টিক নিয়ে মারতে থাকে, তখন ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন আবরারের হাত ধরে থাকে, উপ- সমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল পায়ে মারতে থাকে, সদস্য মুনতাসির আল জেমি, মো. মুজাহিদুর রহমান মুজাহিদ এবং মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভির ও একই বিভাগের চতুর্থ বর্ষেল ইসতিয়াক আহম্মেদ মুন্নাও একইভাবে নির্দয়ভাবে আবরারকে মারতে শুরু করে।

এভাবে কেউ হকিস্টিক দিয়ে, কেউ লাঠি দিয়ে আবার কেউ কিল, ঘুষি, অর্থাৎ যে যার মত মারতে থাকলে অসহায় আবরার কাঁদতেও পারেননি। কারন তখন তার মুখ চেপে ধরে মারতে থাকে তারা। আর এর কিছুক্ষণের মধ্যেই ওই কক্ষে ঢোকেন বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল ও সহ-সভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদ। তারাও বসে না থেকে নিস্তেজ হয়ে পড়া আবরারকে মারধর করে। আর এভাবেই এক সময় আবরার মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ে।

সোমবার (০৭ অক্টোবর)পর্যন্ত এ ঘটনায় গ্রেফতার ১৩ জনের অনেকেই পুলিশের কাছে নৃশংস ঘটনার বর্ণনা করেছে।

ডিবি সূত্র জানায়, আবরারকে মারধরের ঘটনায় সরাসরি অংশ নেওয়া ১০ জনকে গত সোমবার রাতে বুয়েট ক্যাম্পাস থেকেই গ্রেপ্তার করা হয়। গতকাল তাদেরকে ১০দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠালে আদালত তাদের প্রত্যেককের ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। এছাড়া এ হত্যার ঘটনায় গতকাল মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে তিনটায় রাজধানীর ঝিগাতলা এলাকা থেকে শামসুল আরেফিন রাফেদ (২১) নামে আরো একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর ১৭ম ব্যাচের ছাত্র। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এজাহারনামী আসামী মনিরুজ্জামান ও এজাহারের বাইরে আকাশ নামে দুই জনকে গ্রেফতার করে।

ডিএমপি’র ভারপ্রাপ্ত কমিশনার কৃষ্ণ পদ রায় বলেন, প্রাথমিক তদন্ত ও ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা ভিডিও ফুটেজ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিহত বুয়েট ছাত্র আববার হত্যাকাণ্ডে ১৯ জনের তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে ১৩ জনকে গ্রেপ্তার হয়েছে। এর মধ্যে ১০ জনকে রিমাণ্ডে নেওয়া হয়েছে। এজাহারভুক্ত বাকি আসামিদেরকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘এভাবে কোন ছাত্রকে বা একজন মানুষকেই কেউ কি মারে। একটা বাচ্চা ছেলেকে ওরা মারতে মারতে মেরেই ফেলল। ঘটনায় আমি বিস্মৃত হয়েছি।’ তার মত আরো অনেক গোয়েন্দা কর্মকর্তাও একই কথা বলেন।

গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল ও সহ-সভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদকে গ্রেপ্তার করে চকবাজার থানা পুলিশ। তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদকারী এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘সোমবার গভীর রাতে এ দুজন জিজ্ঞাসাবাদে আবরারকে নির্যাতনের কথা স্বীকার করে। তারা এখন বলছে, ‘আবরারকে মেরে নিজেদের লাইফও শেষ হয়ে গেল। এখন নিজেরাও বাঁচতে পারবো না।’

হত্যার নেপথ্যের সম্ভাব্য কারণ:

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সাম্প্রতিক কিছু চুক্তির সমালোচনা করে ফেসবুকে আববারের কিছু স্ট্যাটাস রয়েছে। তবে শুধু এই কারনেই আবরারকে হত্যা করা হয়েছে তা নিয়ে নানান বিতর্ক আছে। এই নিয়ে গত দুই দিন ধরে বুয়েটসহ ঢাকার বাইরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসগুলোতেও চলছে বিক্ষোভ। এই নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও চলছে ব্যাপক সমালোচনা।

কেউ কেউ আবরারকে ভারত বিরোধী আন্দোলনে প্রথম শহীদ হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ ফেনী নদীর নাম পরিবর্তন করে আবরার নদী নামকরণের দাবি তুলেছে। কেউ কেউ আবরারকে নিয়ে গান ও কবিতা লিখেছেন। এসব গান ও কবিতা ফেসবুকে যার যার আইডি থেকে পোস্ট করা হয়েছে। তবে দীর্ঘ দিন ধরে বুয়েটের বিভিন্ন হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের নির্যাতনের বিষয়টি কেউই মুখ ফুটে প্রতিবাদ করেনি।

ছাত্রলীগের নেতাদের কথা না শুনলে তাকে শিবির আখ্যা দিয়ে নির্যাতন চালানোর ঘটনা নতুন কিছু নয়। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া শিক্ষার্থীদের ফলো করতেন ছাত্রলীগের বখে যাওয়া এসব নেতারা। এমনকি কেউ তাবলীগ জামায়াতে অংশ নিলে তাকে কক্ষে ডেকে নিয়ে র‌্যাগিং করা হতো বলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা অভিযোগ তুলেছে।

সে রাতে যা ঘটেছিল:

রবিবার বিকালে কুষ্টিয়ার গ্রামের বাড়ি থেকে হলে ফেরেন আবরার। এরপর সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি হলের নিজ কক্ষেই ছিলেন। এরপর রাত ৮টার দিকে আবরারসহ দ্বিতীয় বর্ষের সাত জন ছাত্রকে শেরেবাংলা হলের দোতলার ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে পাঠান তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের আট নেতা।

তারা আবরারের মোবাইল ফোন নিয়ে ফেসবুক ও মেসেঞ্জার ঘেঁটে দেখেন। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্রিকেট স্টাম্প দিয়ে তারা আববারকে বেদম মারপিট করতে শুরু করে। তাদের মধ্যে কেউ আবরাতের পায়ে স্টাম দিয়ে পেটায়, কেউ হাত ধরে রাখে, কেউ মুখ চেপে ধরে যেন আবরার চিৎকার করতে না পারে আবার কেউ অন্য লাঠি দিয়ে মারতে থাকে। তারা আবারের কোমর থেকে দুই পায়ের তলা পর্যন্ত ব্যাপক মারধর করে। এরই এক পর্যায়ে এক সময় নিস্তেজ হয়ে পড়ে আবরার। এ অবস্থায় ওই কক্ষে ঢোকে চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের আরো কয়েজন। সব মিলে সেখানে ১৯ জন ছিল। এ সময় ওই কক্ষে যে ঢুকেছে তারাই পিটিয়েছে আবরারকে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা পুলিশকে জানায়, ধরে নিয়ে পেটানোর সময় এক পর্যায়ে আবরার নিস্তেজ হয়ে পড়লেও তার উপর নির্যাতন থামেনি। যখন আবরার নড়াচরা করার শক্তি হারিয়ে ফেলেন তখন ছাত্রলীগের নেতারা আবরারের হলের সহপাঠিদের ডেকে এনে তাদের দিয়ে নেথর দেহটি দোতলা ও নিচ তলার মাঝামাঝি সিড়িতে নিয়ে ফেলে রাখে। এরপর রাতে যখন ছাত্রলীগের নেতারা যখন রুম থেকে রাতের খাবার খেতে চানখারপুলে যাওয়ার পর নিশ্চিত হয় যে আবরার আর বেঁচে নই। এই নিয়ে তখন অন্য ছাত্ররা কোন কথা বলেনি।

মামলার তদন্তভার ডিবিতে:

হত্যার ঘটনায় চকবাজার থানায় রুজুকৃত মামলার তদন্তভার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) তে হস্তান্তর করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বিকালে মামলাটি গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হতে পারে বলে সকালে জানিয়েছিলেন চকবাজার থানার ওসি সোহরাব হোসেন। সোমবার সিআইডির ক্রাইম সিন ২০১১ নম্বর কক্ষ থেকে হত্যার বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে। এদের মধ্যে হকিষ্টিকও ক্রিকেট স্টাম্প, রক্তাক্ত জামা-কাপড় এবং সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ।

মামলা তদন্ত সংশ্লিষ্ট ডিবির একজন কর্মকর্তা বলেন, শের-ই-বাংলা হলের দোতালার বারান্দার সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ থেকে প্রায় আধাঘন্টার ভিডিও ফুটেজ জব্দ করে। পরে আরেকটি সিসি ক্যামেরায় রবিবার রাত ৮ টা থেকে রাত ২ টা পর্যন্ত ভিডিও ফুটেজ থাকার তথ্য পাওয়া যায়। ওই ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ নিয়ে হল প্রভোস্টের কক্ষে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের বাক-বিতন্ডা হয়।

শিক্ষার্থীরা ওই ৬ ঘন্টার ভিডিও ফুটেজ তাদের কাছে দেওয়ার দাবি জানায়। শিক্ষার্থীরা প্রভোস্টের কক্ষে আন্দোলন করে। প্রায় ৫ ঘন্টা ধরে পুলিশকে অবরুদ্ধ করে রাখে। এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা ওই ৬ ঘন্টার ভিডিও ফুটেজ কপি করে নিয়ে যায়। শিক্ষার্থীরা জানায়, পুলিশ ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহের চেস্টা যাতে না করতে পারে, সেজন্য তারা এই ৬ ঘন্টা ভিডিও ফুটেজ কপি করে রেখেছে।

গ্রেপ্তার ১৩ জন হত্যার ঘটনায় গ্রেফতারকৃতরা হলেন, বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল (সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, দ্বিতীয় বর্ষ), সহ-সভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদ (সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, দ্বিতিয় বর্ষ), সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন (মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, চতুর্থ বর্ষ), তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার (মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, চতুর্থ বর্ষ), ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন (নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং, চতুর্থ বর্ষ), উপ-সমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল (বায়ো মেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং, তৃতীয় বর্ষ), সদস্য মুনতাসির আল জেমি (মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, দ্বিতীয় বর্ষ), মো. মুজাহিদুর রহমান মুজাহিদ (ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং, তৃতীয় বর্ষ), খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভীর (মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, তৃতীয় বর্ষ) ও একই বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ইসতিয়াক আহম্মেদ মুন্না। এছাড়া এ হত্যার ঘটনায়

গতকাল মঙ্গলবার (০৮ অক্টোবর) বিকাল সাড়ে তিনটায় রাজধানীর ঝিগাতলা এলাকা থেকে শামসুল আরেফিন রাফাত (২১) নামে আরো একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ১৭তম ব্যাচের ছাত্র। এছাড়া আকাশ ও মনিরুজ্জামান নামে দুই জনকে গ্রেফতার করা হয়।

নিউজ২৪.ওয়েব/ডেস্ক/মৌ দাস.

newsone

Read Previous

ক্যাসিনো সম্রাটের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক আইনে দুই মামলা

Read Next

সম্রাটের রিমান্ড শুনানি ১৫ অক্টোবর: সেলিমের ১০ দিনের রিমান্ড চেয়েছে সিআইডি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *