জিসান-খালেদ সম্রাটকে হত্যা করতেই ৫টি একে-২২ রাইফেল এনেছিল

অনলাইন ডেস্ক: রাজধানীর ৩০ টি ক্যাসিনোসহ ঠিকাদার ও ভবন নির্মাণে যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন সম্রাটের মাসে ৫০ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হতো। এই বিপুল পরিমান চাঁদাবাজির একটা বিরাট অংশের প্রতি টার্গেট ছিল বিদেশে আত্মগোপন করা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের। এদের মধ্যে দুবাইয়ে আত্মগোপন করা জিসান, রনি এবং ভারতে আত্মগোপন করা শাহাদত, আশিকের নাম ছিল তালিকায় শীর্ষে।

রাজধানীর বাড্ডা, মতিঝিল, মালিবাগ, শাজাহানপুর, মগবাজার এবং খিলগাঁও এলাকার চাঁদাবাজির একটি বড় অংশ জিসানের কাছে পৌঁছে যেতো। ধীরে ধীরে জিসান সম্রাটের চাঁদাবাজির সাম্রাজ্যের দিকে হাত বাড়ায়। মাসে ১০ লাখ টাকার পরিবর্তে চাঁদার অংক পৌঁছে যায় ১০ কোটি টাকা। এই নিয়ে জিসানের সঙ্গে সম্রাটের বহুবার কথোপকথন হয়।

গত বছরের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচনের আগে সিঙ্গাপুরে ম্যারিনা বে স্যান্ডস হোটেলে জিসানের সঙ্গে সম্রাট ও খালেদের বৈঠক হয়। সেখানে জিসান সম্রাটের কাছে ১০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে। সম্রাট জানায়, তিনি এখন রাজধানীর ডন। তিনি কাউকে চাঁদা দিতে পারবেন না। এমনকি মাসের ১০ লাখ টাকা চাঁদা পাঠানোও বন্ধ করে দেয় সম্রাট। এ নিয়ে জিসান হাত মেলায় খালেদের সঙ্গে।

গত এপ্রিলে দুবাইয়ে জিসান-খালেদ বৈঠক হয়। সেখানে সম্রাটকে হত্যা করার পরিকল্পনা নেয়া হয়। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসাবে বান্দরবন থেকে খালেদ ৫ টি একে-২২ রাইফেল ঢাকায় নিয়ে আসে। এদের মধ্যে গত ৩০ জুন রবিবার সায়দাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকা ও খিলগাঁও থেকে ২ টি একে-২২ রাইফেল উদ্ধার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এ ঘটনায় গ্রেফতারকৃত ৪ জনের কাছ থেকে ডিবি জানতে পারে যে, চাঁদাবাজির আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রনের জন্য জিসান-খালেদের নির্দেশে তারা এসব একে-২২ রাইফেল ঢাকায় এনেছিল।

হত্যার পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যাওয়ার আগেই সম্রাট বিষয়টি টের পায়। এরপর থেকে সম্রাট ও খালিদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। সম্রাট তার চলাফেরায় অনেকটা গোপনীয়তা নিয়ে আসেন। তাকে বহন করা গাড়ির আগে ও পিছে অন্তত ৬ টি গাড়িতে ক্যাডার বাহিনী নিয়োজিত করেন। এসব ক্যাডার বাহিনীর কাছে অন্তত ২০/২৫ টি আগ্নেয়াস্ত্র ছিল বলে খালেদ গোয়েন্দা সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে। এমনকি সম্রাট বিশ্বস্ত কেউ না হলে, তার সঙ্গে সাক্ষাতও বন্ধ করে দেন। প্রতিনিয়ত সড়ক পরিবর্তন করে সম্রাটের গাড়ির বহর যেতো। পল্টন বক্স কালভার্ট সড়কে সম্রাটের গাড়ির বহরে অবৈধ ২০/২৫ টি আগ্নেয়াস্ত্র বহনের তথ্য পায় একটি গোয়েন্দা সংস্থা।

এদিকে, দুবাইয়ে জিসান গ্রেপ্তার হওয়ার খবরের পর ঢাকায় অবস্থানকারী তার ক্যাডার বাহিনীর আন্তত ৪০ জন সদস্যকে খুঁজছে গোয়েন্দারা। তাদের বেশিরভাগ আগ্নেয়াস্ত্র বহন করে। যদিও খবর রয়েছে, অনেকেই এরই মধ্যে সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করে বিদেশে পালানোর চেষ্টায় রয়েছে। সেই সঙ্গে জিসান, সম্রাট ও খালেদকে সহযোগিতা করতেন সাবেক ও বর্তমান সরকারের অন্তত এক ডজন রাজনীতিবিদ। তাদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রী, এমপি, সিটি কর্পোরেশনের মেয়রসহ এমপি মন্ত্রীদের ভাই ও স্বজনরাও রয়েছে।

গতকাল পুলিশ সদর দপ্তরের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোর (এনসিবি) সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) মহিউল ইসলাম বলেন, দুই-তিন মাস আগে থেকে দুবাই ইন্টারপোল শাখা জিসানের ব্যাপারে খোঁজ খবর নিচ্ছিল। সর্বশেষ জিসান আলী আকবর চৌধুরী নাম দিয়ে ভারতের পাসপোর্ট নিয়েছিল- সে বিষয়েও আমাদের কাছে তথ্য ছিল। দুবাই ইন্টারপোল তাকে অনুসরণ করে সকল প্রকার তথ্য সংগ্রহ করে। ওই সব তথ্য ঢাকায় এনসিবিতে পাঠিয়ে দেয়।

ওই সব তথ্য ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে দুবাই ইন্টারপোলের দেয়া তথ্য অনুযায়ি ওই ব্যক্তি জিসান। এরপর এ ব্যাপারে চিঠি চালাচালি করা হয়। এর আগে মাস খানেক আগে আমি দুবাই গিয়ে আমাদের দুই অপরাধীকে আটক করে ঢাকায় নিয়ে আসি। গত বুধবার দুবাই ইন্টারপোল জিসানকে আটক করে পুলিশের কাছে দিয়ে দেয়। তারা বাংলাদেশের এনসিবিকে জানায় যে, ওই ব্যক্তি সম্পর্কে পর্যাপ্ত নথিপত্র দিয়ে দ্রুত দেশে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এনসিবি সূত্রে জানা গেছে, জিসানের বিরুদ্ধে ৫ টি হত্যা মামলা ও ৬ টি চাঁদাবাজির মামলার নথিপত্র দুবাই ইন্টারপোলের কাছে পাঠানো হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ২০০০ সালে মতিঝিলে আরামবাগ ক্লাবে বুলু খুন, ২০০৩ সালে সানরাইজ হোটেলে দুই পুলিশ কর্মকর্তা খুন, ২০০৯ সালে মেরুল বাড্ডায় তুবা গ্রুপের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের শ্বশুর হত্যাসহ ৫ টি হত্যা মামলার নথি পাঠানো হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার আব্দুল বাতেন বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান ডিবির দুই পুলিশ সদস্য হত্যাসহ বহু অপকর্মের হোতা। সেই সঙ্গে ঢাকায় অবস্থানকারী জিসানের ক্যাডার বাহিনীর সদস্যদের গ্রেপ্তার করার চেষ্টা চলছে।

নিউজ২৪.ওয়েব/ডেস্ক/মৌ দাস.

newsone

Read Previous

ভিক্টিমের বাসার চিত্র কখনোই বদলায় না

Read Next

ক্যাসিনো সম্রাটের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক আইনে দুই মামলা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *