প্রিয়া সাহার দিয়াশলাই ও প্রধানমন্ত্রী’র পানি : ষড়যন্ত্রের নেপথ্য কথা!

  •  প্রিয়া সাহার দিয়াশলাইয়ের আগুন যখন দাউদাউ করে জ্বলছিল,সুযোগ বুঝে ষড়যন্ত্রিদের পাশাপাশি অনেকেই আবেগে ঘি ঢালছিলেন ঠিক তখনি বঙ্গবন্ধু কন্যা টের পেলেন অন্যকিছু! তাৎক্ষণিক লেলিহান শিখায় পানি ঢাললেন দূরদর্শী প্রধানমন্ত্রী। নিভল আগুনের ভয়াবহতা! তবে,ভেতরের চাপা রেশ নিয়ে সন্দেহ এখনো পুরোপুরি কাটেনি।

নিউজ২৪ ডেস্ক: আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে প্রিয়া সাহার অভিযোগের ভিডিওটি প্রথম ফেসবুকে ছড়ায় জামায়াতে ইসলামীর মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত বাঁশের কেল্লা নামে একটি একাউন্ট থেকে। সেখানে শুরুতে ভিডিও পোস্ট করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গালাগাল করে বলা হয়, ‘যে হিন্দুরা সকাল সন্ধ্যা আওয়ামী লীগ ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না সেই হিন্দুরা এখন ট্রাম্পের কাছে বিচার দিচ্ছে।’

১৮ জুলাই রাত থেকে ভিডিওটি বাঁশের কেল্লার একাধিক একাউন্ট ও তাদের সদস্যদের একাউন্ট থেকে প্রচার করার পর বিএনপি ও অন্যান্য দল এমনকি আওয়ামী লীগ ও সাধারণ লোকজনও এতে প্রতিক্রিয়া জানাতে থাকে। এক পর্যায়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জনাব মো. শাহরিয়ার আলম ফেসবুকেই প্রিয়া সাহার বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানান।

প্রিয়া সাহাকে নিয়ে সরকারের আপাতত প্রতিক্রিয়া সেখানেই শেষ হতে পারতো। কিন্তু ২০ জুলাই সরকারের বেশ ক’জন মন্ত্রী প্রিয়া সাহার বক্তব্যের ব্যাপারে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। এমনকি সরকারের মন্ত্রীরা প্রিয়া সাহাকে ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দিয়ে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দেন।

২০ জুলাই সাংবাদিকদের একটি গ্রুপ সংঘবদ্ধভাবে মিডিয়াতে প্রচার করে, আমেরিকান অ্যাম্বাসেডর প্রিয়া সাহার বক্তব্য সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন। ওই খবরের ভিত্তিতে মন্ত্রীরাও বলেন, আমেরিকান অ্যাম্বাসেডরও প্রিয়া সাহার বক্তব্য সমর্থন করেননি।

আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায় থেকে আমেরিকান অ্যাম্বাসেডরের বরাত দিয়ে প্রিয়া সাহার বক্তব্য নাকচ করার খবর ফেসবুকে প্রচার হওয়া শুরু করলে আমেরিকান অ্যাম্বাসি মিডিয়া অফিসগুলোতে ফোন করে বলতে থাকে, অ্যাম্বাসেডর প্রিয়া সাহার বক্তব্য নিয়ে কোনো কিছু বলেননি। এরপর আবার জামায়াত-শিবিরের বাঁশের কেল্লা একাউন্ট থেকে উল্লাস প্রকাশ করে প্রচার করা হয়, আওয়ামী লীগের মন্ত্রীরা আমেরিকান অ্যাম্বাসেডরের বক্তব্য জালিয়াতি করে ধরা খেয়েছে।

২১ জুলাই ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় অতি উৎসাহীরা প্রিয়া সাহার বিরূদ্ধে মামলা করেন। তবে পরিস্থিতি বদলে যায় আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যে। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রিয়া সাহার কাছ থেকে ব্যাখ্যা পাবার আগে তার ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা না নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। বিষয়টি ঘাপটি মেরে থাকা বিএনপি-জামায়াতের কর্মীদের হতাশ করলেও সংখ্যালঘুদের মাঝে স্বস্তির আবহ সৃষ্টি করেছে। প্রিয়া সাহাকে নিয়ে হুমকি ধামকিতে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যেখানে হিন্দুধর্মাবলম্বীরা আক্রান্ত হবার আশঙ্কায় প্রিয়া সাহার বিরূদ্ধে অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছিল। অথচ প্রিয়া সাহা আমেরিকান প্রেসিডেন্টের কাছে যে কথা বলেছেন তা তারা এ দেশে অহরহ বলে থাকেন। এগুলো মিডিয়াতেও এসেছে।

প্রিয়া সাহার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়ায় আক্রান্ত সংখ্যালঘু নেতাদের বলতে শোনা গেছে, শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই যদি এমন হয় তবে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসলে কি হতো?
২১ জুলাই ওবায়দুল কাদের শেখ হাসিনার নির্দেশনা জানানোর পর তারাই আবার বলেছেন, এ দেশে যে ব্যক্তি তাদের আশা-ভরসা সেই এবার আবারও তাদের বাঁচালেন। শেখ হাসিনা এ ব্যাপারে যে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতা দেখালেন তা অন্য মন্ত্রীরা কেন দেখাতে পারলো না? তাদের শঙ্কার বিষয়টি এ জায়গাতেই। কারণ ব্যক্তি শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগ তো আর সারা জীবন ক্ষমতায় থাকবে না।

কোন সন্দেহ নেই, গত কয়েক দিনের ঘটনা এ দেশে সংখ্যালঘুদের বিশেষ করে হিন্দুদের এ দেশে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা সৃষ্টি করেছে। তারা সুনির্দিষ্টভাবে দাঙ্গা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার হুমকি পাচ্ছিলেন।

প্রিয়া সাহার বক্তব্য নিয়ে সরকার ও সোশ্যাল মিডিয়া অতি প্রতিক্রিয়া দেখালেও বিষয়বস্তু মোটেও নতুন নয়। বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে কমার খবর আলোচনায় আসছে ২০১০ সাল থেকেই। ২০১০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর দৈনিক প্রথম আলোর শেষ পৃষ্ঠায় বেশ বড় করেই ছাপা হয়েছিল-‘আদমশুমারির তথ্য মতে, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা কমেছে প্রায় ২৪ শতাংশ, দেশে সংখ্যালঘুদের সংখ্যা কমছে’ (http://archive.prothom-alo.com/detail/news/92092)। সরকার তখন এ প্রতিবেদনকে মিথ্যা বলে দাবি করেনি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০১৪ সাল থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে এক বছরের ব্যবধানে দেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষের সংখ্যা বেড়ে মোট জনসংখ্যার ১০.৭ শতাংশ হওয়ার তথ্য প্রকাশ করলে বিবিসি খবর প্রচার করেছিল ‘বাংলাদেশে হিন্দুদের সংখ্যা এত বাড়ল কীভাবে?’ (https://www.bbc.com/bengali/news/2016/06/160623_bangladesh_hindu_population_rise_)

বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বী কমার সবচেয়ে আতঙ্কজনক খবরটি উঠে আসে ২০১৬ সালের নভেম্বরে অধ্যাপক আবুল বারকাতের ‘বাংলাদেশে কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কারের রাজনৈতিক অর্থনীতি’ শীর্ষক এক গবেষণায়। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন, ১৯৬৪ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ৫ দশকে মোট ১ কোটি ১৩ লাখ হিন্দু ধর্মাবলম্বি মানুষ দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে ২ লাখ ৩০ হাজার ৬১২ জন হিন্দু ধর্মাবলম্বি মানুষ নিরুদ্দিষ্ট বা দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। আর প্রতিদিন দেশ ছেড়েছেন গড়ে ৬৩২ জন হিন্দু। এই হার অব্যাহত থাকলে তিন দশক পর এ দেশে কোন হিন্দু ধর্মাবলম্বী থাকবে না বলে তিনি তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেছেন।

ড. বারাকাতের গবেষণায় বলা হয়েছে, বিভিন্ন সময়কালে প্রতিদিন গড়ে নিরুদ্দেশ হওয়া হিন্দুদের সংখ্যা সমান নয়, যেমন-১৯৬৪ থেকে ১৯৭১ পাকিস্তানের শেষ ৭ বছর প্রতিদিন নিরুদ্দেশ হয়েছেন ৭০৫ জন হিন্দু। ১৯৭১ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত প্রতিদিন নিরুদ্দেশ হয়েছেন ৫২১ জন। ১৯৮১ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত প্রতিদিন নিরুদ্দেশ হয়েছেন ৪৩৮ জন। ১৯৯১ থেকে ২০০১ পর্যন্ত প্রতিদিন ৭৬৭ জন হিন্দু দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। আর ২০০১ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ৬৭৪ জন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ দেশ থেকে নিরুদ্দেশ হয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকার অধ্যাপক আবুল বারাকাতের ঐ গবেষণার ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করেনি। চ্যালেঞ্জ করলেও হয়তো সফল হওয়া কঠিন হতে পারে।এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ সাল থেকে এ দেশে সংখ্যালঘু কমার হিসাব নিকাশ করলে প্রিয়া সাহার তথ্যের খুব একটা ভুল পাওয়ার সম্ভাবনা কম।

প্রিয়া সাহার দেওয়া ৩৭ মিলিয়ন সংখ্যালঘু কমার তথ্য নিয়ে যখন এত বিতর্ক চলছে তখন এর চেয়ে আরও অনেক বেশি (৪৯ মিলিয়ন) সংখ্যালঘু বাংলাদেশছাড়ার তথ্য আমেরিকান কংগ্রেসের লাইব্রেরিতেই আছে। ২০১৩ সালে আমেরিকান কংগ্রেসের টম ল্যান্টোস মানবাধিকার কমিশনের হিয়ারিংয়ে আমেরিকার স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইয়র্কের অধ্যাপক সাচি ডি দাস্তিদার দাবি করেছেন-’49 million Hindus missing from Bangladesh’
সেদিনের হিয়ারিংয়ের ভিডিও ইউটিউবেও পাওয়া যায় (https://www.youtube.com/watch?v=cGq_RZfnwx4)।

সুইডেন সরকারের অর্থায়নে মাইনোরিটি রাইটস গ্রুপের ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসের প্রতিবেদনে (https://minorityrights.org/wp-content/uploads/2016/11/MRG_Rep_Ban_Oct16_ONLINE.pdf) বলা হয়েছে, ‘ The decline of the Hindu population, from more than 22 per cent in the 1940s to less than 9 per cent today, is the result of this exodus: between 1964 and 2001, for instance, an estimated 8.1 million ‘missing Hindus’ left, amounting to around 219,000 people annually. Continued discrimination, land grabbing and the growing threat of violence have meant that Bangladeshi Hindus have continued to emigrate, in many cases irregularly, to India.’

২০১৭ সালে জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের আলোচনায়ও বাংলাদেশ মাইনোরিটি কাউন্সিলের পক্ষ থেকে প্রশ্ন করা হয়েছিল-‘About 49 million Hindus are missing. Where are they?'(https://www.ohchr.org/Documents/HRBodies/HRCouncil/MinorityIssues/Session10/Item5/AdditionalStatements/item5%20-%20Bangladesh%20Minority%20Council%20.pdf)

তাই এ দেশ থেকে ৩৭ বা ৪৯ মিলিয়ন হিন্দু ‘মিসিং’ হবার তথ্য বৈশ্বিক অঙ্গণে নতুন নয়। একইভাবে তাদের আক্রান্ত হওয়া, জমি দখল, মন্দির-প্রতীমা ভাঙচুরের অভিযাগও নতুন নয়। বর্তমান সরকারের চেষ্টায় পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে। তবে অতীতে ছিল না বা সমস্যা পুরোপুরি চলে গেছে এটিও নয়।

প্রিয়া সাহাকে নিয়ে বাংলাদেশে গত কয়েক দিনের পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে ইন্ডিয়ান হাই কমিশন ও আমেরিকান অ্যাম্বাসি।

অনলাইন ও সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় জামায়াত শিবির ও বিএনপি প্রিয়া সাহার বক্তব্য নিয়ে বিশেষ স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্যে ক্যাম্পেইন করেছে। একদিকে তারা আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক হিসেবে পরিচিত হিন্দুদের আক্রমণের চেষ্টা চালিয়েছে। অন্যদিকে প্রিয়া সাহার বক্তব্যকে পুরোপুরি ভুল প্রমাণ করে তারা এ দেশে সংখ্যালঘুদের উপর হামলার ইতিহাস আড়াল করতে চেয়েছে। সর্বোপরি তারা এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করতে চেয়েছে যাতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশে সাম্প্রদায়িক সংঘাত হয় এবং এর দায় আওয়ামী লীগের কাঁধে পড়ে। আর আওয়ামী লীগ সরকারের উপর ভারত ও আমেরিকার চাপ সৃষ্টি হয়।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরা বরাবরই বলে থাকেন, এ দেশে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলগুলোতেই তারা তুলনামূলক নিরাপদে থাকেন। তাদের উপর আক্রমণ হয় মূলত বিএনপি জামায়াতের আমলে। প্রিয়া সাহার বক্তব্যকে আমলে নিয়ে বা ৩৭ মিলিয়ন হিন্দু ধর্মাবলম্বী হারিয়ে যাবার ব্যাখ্যা নিলে অতীতে তাদের উপর নির্যাতনগুলোর জন্য দায়ীদের নতুন করে চিহ্নিত করার সুযোগ সৃষ্টি হতো। এটি বিশ্বে আরো ভালো বার্তা যেতো। যেমন দু’মাস আগে কানাডা সরকার তাদের নিজেদের দেশে একটি সম্প্রদায়ের উপর নিপীড়নের কথা স্বীকার করেছে। বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা কমা বা তাদের উপর নির্যাতন-নিপীড়নের মূল দায় আওয়ামী লীগ বা আওয়ামী লীগ সরকারের উপর পড়ার কথা নয়।

নিউজ২৪ ডেস্ক/সংবাদদাতা/হৃদয়

MD Hridoy

Read Previous

কাফরুলে খ্রিস্টানদের জমি দখল করে সন্ত্রাসীদের দিয়ে প্রাণ নাশের হুমকির অভিযোগ

Read Next

রিফাত হত্যাকাণ্ড : মুখোশ খুললে সুনামের সবই দুর্নাম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *